গর্ভধারিনি by সমরেশ মজুমদার PDF Free Download
গর্ভধারিনি by সমরেশ মজুমদার PDF Free Download
কোনো বই পড়ে আপনার কখনও রিডার্স ব্লক হয়েছে? গর্ভধারিণী পড়ার পর একমাসেরও বেশি সময় আমি অন্য কোন বই পড়তে পারিনি, শুরু করলেও শেষ হয়নি। এরপর একটানা কয়েকটা বই পড়ে মনে হচ্ছে সাথে রাইটার্স ব্লকও হয়েছিল। গর্ভধারিণী পড়ার পর থেকে আর একটা রিভিউও লিখিনি, অথচ পড়ার পর এই লেখাটা আমি খুবই উপভোগ করি।
জয়িতা,আনন্দ,সুদীপ আর কল্যান। চারজন চার রকম পরিবেশে বড় হয়েছে, প্রেসিডেন্সীতে পড়ার সময় পরস্পরে বন্ধু হয়ে উঠে।মানবিক মূল্যবোধ থেকে সমাজ সচেতনতা উঁকি দেয় সদ্য যৌবনে পা রাখা এদের ভিতর স্বতন্ত্রভাবে। অসম অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙ্গে দিতে চায়।সব দায়-দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর উপর চাপিয়ে হাত-পা গুটিয়ে পুরনো মানুষের মতো বাঁচতে বিবেকে বাঁধে।অন্তত কিছুটা হলেও নাড়া দিতে চায় ওরা যাতে এই চুপসে পরা সংস্কারাগ্রস্ত বাঙালী অবিচারের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তোলে;তবে ওরা কোন রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত নয় এমনকি কোন বাম দলও নয়।
চারজনের ভিতর সুদীপ রগচটা, খানিকটা খেয়ালী; আনন্দ ঠাণ্ডা মাথার ছেলে, কথা দিয়ে সহজে অন্যের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। জয়িতা বিপদে বুদ্ধি খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, নিঃসেন্দহে জয়ী এই উপন্যাসের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্র! জয়ীর ভূমিকাটুকু বললে গোটা উপন্যাসের কাহিনী বলা হয়ে যায় । কল্যাণ সবচেয়ে ভালো ছাত্র, তবু তার মধ্যে বহু মধ্যবিত্ত সংস্কার রয়ে গেছে। আনন্দটা ছাড়া বাকি সবারই চিন্তা ভাবনা পরিবারের সাথে অসমতল।
অল্প বয়সের কিছু উদ্দীপনা, পরিবর্তনের চেষ্টায় যে ব্যাকুলতা তার ছাপ চরিত্রগুলোর প্রতিটা কথায়, আলোচনায় টের পাওয়া যায়। হঠাৎ খুঁজে পাওয়া রেনেসাঁর স্পর্শে সব ভেদাভেদ দূর করার প্রচেষ্টায় মত্ত চার তরুণ-তরুণী। যে কোন ভেদাভেদ; হোক সেটা ধনী-গরীবের, হোক সেটা নারী-পুরুষের।
একে একে ওরা আক্রমণ করে ধনীদের অনৈতিক বিনোদনের স্বর্গ, 'প্যারাডাইস', একটি জাল ওষুধের কারখানা।
তারপর ঠাকুরপুকুরের এক পুরনো বাড়িতে আশ্রয় নেয় আর লক্ষ্য করতে থাকে মানুষের প্রতিক্রিয়া।সরকারি নেতা কর্মী বিদ্রোহী ডাকাত বললেও সাধারণ মানুষদের অনেকেই বাহবা দিতে থাকে তবে অবশ্যই জনসম্মুখে নয়। একসময় পুলিশের নজরে চলে আসে এরা,ছবিসহ পত্রিকায় ছাপা হয়। পালানোর আগে এক মন্ত্রীকে শেষ করে যায়, যে কিনা মুখে সাম্যবাদীর বুলি আওড়ায় আর ভিতরে ভিতরে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানো,সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয়দাতা ,ঘুষ আদান প্রদানের মূল।
এবার শুরু হয় নতুন সংগ্রাম, ফেরারি জীবন।চারজন দুভাগ হয়ে শিলিগুড়ি চলে যায়, কলকাতা ছাড়ার আগে বেশকিছু টাকা,জামা কাপড়,প্রচুর ওষুধসহ মাস দেড়েকের রসদ নিয়ে নেয়।শিলিগুড়ি থেকে জীপে করে দার্জিলিং; সর্বত্র পুলিশের ভয়। যেখানে সেখানে পুলিশ হানা দেয় তাই ওরা প্লান করে ভারতীয় পুলিশের আওতার বাইরে এমন এক জায়গা খুঁজে বের করতে হবে।ম্যাপ দেখে নেপাল বর্ডারের চ্যাঙথাপু গ্রামকে টার্গেট করে। ভোর না হতেই দার্জিলিং হতে আসে সান্দাকফু, ট্রেকিং করে সান্দাকফুতে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে যখন ক্লান্ত; কুয়াশা সরে গিয়ে যখন তাদের সামনে বুক চিতিয়ে দাড়ায় নয়নাভিরাম কাঞ্চনজঙ্ঘা, চোখ শীতল হয়ে আসে, সব অবসাদ মিলিয়ে যায় মনে হয় এক হাজার বছর কাটিয়ে দেয়া যাবে এই নৈসর্গের সামনে দাঁড়িয়ে। একদিকে পুলিশের ভয়, ধরতে পারলে বিচার ছাড়াই রাস্তায় মত মারবে ভালো করেই জানা। আরেকদিকে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমরেশ মজুমদারেরর বর্ণনা। থ্রিলার হিসেবেই পড়েছি এতটুকু, বই এর অর্ধেকটা। কিন্তু জীবনটা থ্রিলার উপন্যাস না, বাস্তবতা অন্যরকম।
অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না অনেক দিন ধরে। মানুষের রুচি কত দ্রুত বদলায়, পছন্দ অপছন্দ বদলাতেই বা কত সময় লাগে! নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ব্যাপারগুলো কিভাবে শুরু হয়, অন্যের জন্য নিজের স্বার্থ কতটা ভুলে থাকা যায়। মানসিকতার পার্থক্যের পরও একসাথে কতটা পথ চলা সম্ভব!
এগুলো ছাড়াও অনেক খটকা এই এক বই পড়ে মিটে গেছে। তবুও কাহিনীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভাবতে গেলে প্রত্যেক বার মাথা ফাঁকা হয়ে আসে। চিন্তাভাবনা উল্টো স্রোতে চলে।
আর কোনো বই সম্ভবত আমাকে গর্ভধারিণীর মত প্রভাবিত করেনি আগে।


0 comments:
Post a Comment